বাল্যবিয়ের গল্প শুনালেন এভ্রিল

মোশাররফ করিমকে নিজের বাল্য বিয়ের গল্প শোনালেন জান্নাতুল নাঈম এভ্রিল। কৈশরে বিয়ে হয়েছিল বলে মিস ওয়ার্ল্ড মঞ্চে উঠতে পারেননি এভ্রিল। স্বপ্নপূরণ হতে হতেও তীরে এসে তরী ডোবার মতো ভেঙে গেছে তার স্বপ্নটা। যেই বাল্যবিয়ে তার স্বপ্ন পূরণে বাধা হলো সেই বিয়ের গল্পটাই সম্প্রতি প্রচার হওয়া চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের ‘জাগো বাংলাদেশ’ অনুষ্ঠানে মোশাররফ করিমের মুখোমুখি বসে শুনিয়েছেন এভ্রিল।

এভ্রিল বলেন,‘ বাবার সঙ্গে শৈশব থেকে আমার বন্ধনটা ছিল অন্যরকম। আমরা চার ভাইবোন। আমার মনে হতো, ওই সময় বাবা আমাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন, আমাকেই প্রাধান্য দিতেন। কিন্তু এসএসসি পরীক্ষার একমাস পর একদিন শুনলাম, আমাকে দেখতে আসবে। হাতে আংটি পরিয়ে দেবে। আমি তো শুনে রেগে কান্নাকাটি শুরু করে দিলাম।’

সেই সময় এভ্রিলের বয়স ১৬ বছর। মোশাররফের সামনে বসে পরের ঘটনাও শোনালেন তিনি, ‘‘কেঁদে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু আমাকে ধরে আনা হলো। সবাই জানালো, এখন আমাকে আংটি পরাতে আসবে। তখন বাবার কাছে জানতে চাইলাম, কেন আমাকে বিয়ে দিতে চাইছো? তার উত্তর ছিল, ‘দেখো, তুমি মেয়ে হয়ে জন্মেছো, আমার তো একটা দায়িত্ব আছে। আমার মেয়েকে আমি বিয়ে দেবো, আমার দায়িত্বটা শেষ করবো’। তখন প্রশ্ন করলাম, আমাকে বিয়ে দিলেই তোমার দায়িত্ব শেষ? তিনি জোর গলায় বললেন, ‘হ্যাঁ, শেষ।’ তখন বাবার পা ধরে খুব কেঁদে বলেছিলাম, বিয়ে করবো না। পড়ালেখা করবো। কিন্তু তিনি কিছুতেই শুনছিলেন না। মনে হচ্ছিল, বাবা পাষাণ হয়ে গিয়েছিলেন!’’

এর কারণও জানালেন এভ্রিল। তিনি দেখেছেন, গ্রামে মধ্যবিত্ত পরিবারে সুন্দরী বা লম্বা মেয়ে থাকলে চারপাশের মানুষ কানাকানি করে। তার কথায়, ‘মানুষ বাবাকে যে চাপ দিচ্ছিল তা নিতে পারছিলেন না তিনি। যদি আমাকে কেউ তুলে নিয়ে যায়, এই ভয় ধরে বসেছিল তাকে। মানসম্মান নিয়ে খুব ভয় পান তিনি। তখন বাবাকে একটা কথা বলেছিলাম, তুমি তোমার দায়িত্ব শেষ করো ঠিক আছে, কিন্তু আজ থেকে তুমি আমার বাবা না। ছোটবেলা থেকে তোমার সঙ্গে আমার এত ভালোবাসার সম্পর্ক, অথচ আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবছো না, আমার স্বপ্নগুলো পূরণ করার কথা তুমি একবারও ভাবছো না, শুধু সমাজের কথা চিন্তা করে একটা ছোট মেয়েকে তুমি বিয়ে দিয়ে দিচ্ছো। তোমার মেয়ের নিরাপত্তা দিতে পারছো না বলে বিয়ে দিচ্ছো, সেক্ষেত্রে তুমি আমার বাবা হতেই পারো না। তার সঙ্গে আমার শেষ কথা ছিল এটুকুই।’

‘মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ’ মঞ্চে জান্নাতুল নাঈম এভ্রিলবিয়ের আসরে কী ঘটেছিল, মোশাররফের সঙ্গে তাও শেয়ার করেছেন এভ্রিল। তিনি বলেন, ‘বিয়েতে মাকে বলেছিলাম, মা আমি সুইসাইড করবো। আমি মরে যাবো। মা আমাকে কানে কানে বলেছিলেন, ‘তুই শুধু বেঁচে থাকবি আমার জন্য। যদি তুই কালকে মরে যাস, তাহলে কিন্তু কবরে একটা লাশ যাবে না, যাবে দুইটা লাশ! কারণ, আমি তোকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি।’

কথায় কথায় অতীত নিয়ে অনেক কথা বললেও সেসব নিয়ে ভাবতে চান না তিনি। নিজেকে সামলে এই সুন্দরী বললেন, ‘আমি শুধু ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে চাই। সারা জীবন আর শেষ নিঃশ্বাস অবধি স্বপ্ন দেখতে চাই। স্বপ্ন দেখা বন্ধ করা যাবে না। মানুষ তখনই ফুরিয়ে যায়, শেষ হয়ে যায়, যখন সে স্বপ্ন দেখতে ভুলে যায়। ওইসব সমাজকে দেখিয়ে দিতে চাই, যারা একটা মেয়ের বয়স নিয়ে ভাবে না, তার বিয়ে হলে কী ঘটতে পারে তা চিন্তা করে না, যারা শুধু দারিদ্র্য, নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন দিক চিন্তা করে মেয়েটাকে শ্বশুরবাড়িতে পাঠালেই যেন বোঝা শেষ।’

এভ্রিলের জীবনের গল্প শোনা শেষে মোশাররফ করিম বলেন, ‘এভ্রিলের বাবা তার মেয়েকে ভালোবাসতেন। সেখানে সমস্যা ছিল না। কিন্তু এভ্রিলকে বিয়ে না দিলে কী কী ঘটতে পারে, সেসব ভয় যে তাকে দেখানো হলো, সেই ভয় থেকে তিনি সরতে পারলেন না। তাই সেই ভয়ের উৎসটাকে তাড়ানো সবচেয়ে জরুরি। যেখান থেকে আমি স্বাধীনভাবে বলতে পারবো- আমি এই হতে চাই, আমাকে হতে দাও। ভয় দেখিও না। কারণ, আমি, এভ্রিলসহ যারা এ দেশের মানুষ, এ দেশের সন্তান, তারা প্রত্যেকেই এ দেশের সম্পদ। তাদের হয়ে উঠতে দিতে হবে। তাই ভয়কে তাড়াতে হবে।’

মোশাররফ চেয়েছিলেন, বাল্যবিয়ের কারণে এভ্রিলের মতো মেয়েদের বেদনা ছুঁয়ে যাক দর্শকের মনকে। যেন দর্শকও ব্যথিত হন আর সবার টনক নড়ে। মোশাররফ করিম বললেন, ‘অনেক কিছু জানলাম, বুঝলাম। বুঝতে পারলাম ঠিকই, কিন্তু নিজের অনুভূতির মধ্যে ঢুকলো কিনা। কতটা করুণ, কতটা খারাপ লাগার। এভ্রিল ও বৃষ্টির মতো হাজার হাজার মেয়ে আছে, যারা হয়তো এর চেয়েও ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।’