বাংলা চলচিত্রঃ বিজলী

“বাহুবালি” ছবির মত সিনেমার শেষে নায়িকার মা বাবার খুনি বা ছবির মুল ভিলেন বেঁচে থাকবে, ভিলেন কেন খুন করল নায়িকার মা বাবা কে, ডঃ গ্রেয় আসলে কে, পুরো ফিল্মে যেই মহিলা খলচরিত্রে ছিলেন তিনি নায়িকার হাতে মরার পর দেখা যায় তিনি প্রধান ভিলেন নন , প্রধান ভিলেন অন্য আরেকজন এমন বেশ কয়েকটি টুইসট এর মধ্য দিয়ে টু বি কনটিনিউড দেখিয়ে পরবর্তী সিকুয়েল দেখার জন্য অসমাপ্ত অবস্থায় এবং সাহসিকতার সাথে এই প্রথম একটি বাংলা সিনেমা হলে গিয়ে দেখলাম । হ্যা আমি এসেছি ফেসবুক এ আজ বাংলার সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও প্রথম সুপার হিরো মুভি “বিজলি” র রিভিউ নিয়ে।

একসময় নায়ক গরিব নায়িকা বড়লোক টাইপের গল্প, ধিশুনায়িম টাইপের মারামারি, জঘন্য পিকচার ও সাউন্ড কোয়ালিটি, নায়ক নায়িকার নিম্নমানের অভিনয় ও নাচ-গান, হলে কিছু বস্তিবাসী টাইপ দর্শক আমাদের হলিউড ও বলিউদ্মুখি করে ফেলেছিল। সেখানে ২য় সারির চিত্রনায়িকা ববিকে ধন্যবাদ দিতে হয় নিজেই এত বর বাজেটের প্রথম সুপার হিরো মুভিটিতে বিপুল অর্থ দিয়ে প্রযোজনা ও একিসাথে সুপার হিরোইন হওয়ার দুঃসাহস দেখানোর জন্য। যেখানে আমরা এ ধরনের মুভির প্রযোজক হিসেবে এত দিন ধরে জাজ, লাইভ টেকনলজিস এবং একসময় শুধু অনন্ত জলিলের নাম জানতাম। প্রযোজক ও নায়িকা ববির অভিনয়, ফিগার, নাচ, পোশাক, কিউটনেস, হট ও স্মার্টনেস আগের থেকে অনেক বেশি উন্নত হয়েছে।

ছবির পরিচালক ইফতেখার চৌধুরী খোঁজ দ্যা সার্চ, অগ্নি, অগ্নি ২, বাংলার কিংকং, রাজত্ত, একশন জেস্মিন, দেহরক্ষীর মত বিগবাজেটের মুভি করে বেশ নাম কুড়িয়েছেন যেখানে তার বেশিরভাগ ছবির নায়িকা ছিল ববি। তবে তার এবারের ছবি বিজলীতে তার আগের ছবির তুলনায় অনেক বেশি সাজান গোছানো গল্প, বাংলাদেশের ও দেশের বাইরের অসাধারণ লোকেশন (এমনকি শাহরুখ খানের দিলওয়ালে মুভির গেরুয়া গানের লোকেশন ব্যবহার করা হয়েছে ছবির একটি গান এ ), উন্নত প্রযুক্তি, অনেকগুলো টুইসট, বলিউড সমতুল্য একশন অনেক সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। তবে নায়ক নায়িকার কেমেস্ত্রি, কমেডি সিন ও গল্পের ও স্ক্রিপ্ট এর ভেতরে আর জোর দেয়া দরকার ছিল কারন বিগ বাজেটের মুভিতে এসব ক্ষেত্রে জোর না দিলে ছবির সময় অনেক দর্শক ধরে রাখা ও তাদের মাধ্যমে বাজেট উঠিয়ে লাভ করা মুশকিল।

ছবির নৃত্য, সঙ্গিত পরিচালক ও শিল্পীদের সঙ্গীত ও নৃত্তের যত প্রশংসা করব ততই কম হবে এক কথায় অসাম। বেকগ্রাউন্ড সাউন্ড মুভির মোটামুটি ভাল আরও ভাল হওয়া উচিত ছিল প্রতিটি দৃশ্য কে আকর্ষণীয় করার জন্য।

ছবির গল্পের শুরুতে দুর্ঘটনায় নায়িকার মা-বাবার মারা যাওয়া , দুর্ঘটনার পরও তাদের হাসপাতালে পৌঁছানোর দৃশ্য অস্পষ্ট ছিল। বিশেষ করে কিভাবে দুর্ঘটনা ঘটল এরপর তাদের হাসপাতালে কে নিল বুজলাম না। হাস্পাতালের রহস্যময় পরিচালক ও নায়কের বোন জেরিন খান এর হাত থেকে আরেক ডাক্তার ইলিয়াস কাঞ্চন ববিকে নিয়ে পালিয়ে যাওয়া, আদর ও লালন পালন করে বড় করা, শাসন করা, নিজের মেয়েকে মাস্ক ম্যান নামক ভিলেন থেকে বাঁচাতে গিয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পরা এককথায় বাবা-মেয়ের সম্পর্ক অনেক সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। ছোটবেলায় ইলিয়াস কাঞ্চন এর সেই অনবদ্য অভিনয় অনেক দিন পর উপভোগ করলাম। তবে বাবা ইলিয়াস কাঞ্চন তার মেয়েকে প্রশিক্ষণের নাম এ শুধু দৌড়াতে শেখাতে গিয়ে কিভাবে ফাইট ও সুপার হিরোর পাওয়ার কন্ট্রোল করা শেখাল বুঝলাম না। ছবিতে অপ্রয়োজনীয় কিছু কনভারসেশন অনেক লম্বা করে ফেলেছেন পরিচালক। ভিলেনদের মাধ্যমে বিজলির রক্ত সংগ্রহ করে সেই রক্ত খেয়ে অন্যতম প্রধান ভিলেন ডঃ জারিন এর হঠাৎ বিজলির মত সুপার পাওয়ার পেয়ে সুপার ভিলেন হয়ে যাওয়াটা এবং বিজলির কিল খেয়ে সুপার ভিলেন হয়েও মারা যাওয়াটা গাঁজাখুরি । আর ভিলেনের ভাই রানভির ছবির নায়ক না নায়িকা, ছবিতে তার গুরুত্ত নেই বলেই চলে। আর কলেজে পড়া অবস্থায় তিনি পরিচয় হতে না হতেই এক প্রপজে যেভাবে বিজলির মত সুন্দরী ও পাওারফুল মেয়েকে বন্ধু, গারফ্রেন্ড বানালেন ও লিপকিস করলেন তা বাঙালি ছেলেদের জন্য অসম্ভব আজকাল :p।

সবচেয়ে মজার বিষয় ছিল ভিলেন জারিন মারা যাওয়ার পর অনেক দর্শক মুভি শেষ মনে করে হল ছেড়ে চলে গেলেন কারন তারা জানতেন না “পিকচার আভি বাকি হেয় মেরে দোস্ত” । ভিলেনের মার খেয়ে আহত নায়ক কে থাইলেন্ডের হাসপাতালে দিয়ে নায়িকা হোটেলে ফেরার সময় কিডন্যাপ এর স্বীকার হন। চোখ খুলতেই দেখতে পান ছবির মেইন টুইস্ট ডঃ গ্রেয় কে (আনিসুর রহমান মিলন)। (যার কর্মী আহমেদ শরীফ, মিজু আহমেদ ইত্যাদি এর মত শক্তিশালী ভিলেনরা হলেও আহমেদ শরীফ, মিজু আহমেদ ইত্যাদিদের ছবিতে দেখানো হয়নি বললেই চলে।) তিনি চমক দেন নায়িকাকে তার দত্তক ডাক্তার ইলিয়াস কাঞ্চন বাবার মরে যাওয়ার সময় রেখে যাওয়া ভিডিও দেখিয়ে যাতে বলা হয় নায়িকার আসল বাবা জাহিদ হাসানের ও মায়ের মৃত্যু দুর্ঘটনায় নয় নায়িকার চাচা মিশা সওদাগরের মাস্টার প্ল্যান এর মাধ্যমে হুয়েছে। ডঃ গ্রেয় কথা দেন মিশা কে থাইলেন্ডে তার আস্তানায় বাংলাদেশ হতে নিয়ে আসলে নায়িকার মা-বাবার আসল পরিচয় মৃত্যুর কারন খুলে বলবেন। নায়িকা রাজি হন আর গিফট হিসেবে পান ডঃ গ্রেয় এর দলের তৈরি করা সুপার হিরো কস্টিউম নিজের পরিচয় গোপন ও পার্সোনাল প্রোটেকশনের জন্য। নায়িকা যাওয়ার পর পরই ডঃ গ্রেয় কে তার এক চামচা জিজ্ঞাসা করেন বস আপনার পরিচয়টা বললেন না যে? তখন ডঃ গ্রেয় এর চোখে নিল রঙের সুপার পাওয়ার দেখা যায় আর তিনি বললেন সময় হলে সব কিছু জানাব। নায়িকা দেশে ফিরেই দুর্ঘটনায় আহত একচোখা মিশার সাথে ফাইট করতে না করতেই হলের স্ক্রিনে চলে আসে টু বি কনটিনিউড ……

বাহুবালি ছবির মত ৩টি প্রশ্ন থেকে গেলঃ
১। ডঃ গ্রেয় কে?
২/ নায়িকার বাব-মাকে কেন খুন করল তার চাচা?
৩/ আহমেদ শরীফ, মিজু আহমেদ, মাস্ক ম্যান এরা দলীয়ভাবে বিজলির পিছনে লেগেছিল কেন ?

উত্তর পেতে অপেক্ষা করুন বিজলি সিরিজের ২য় পার্ট বিজলি – ২ এর জন্য। তবে হা যারা হলিউড – বলিউড মুভির সাথে তুলনা করে বিজলি মুভিটাকে ছোট করতে চান তারা মুভিটা না দেখাই ভাল। অনেক কম সময়ে দেশের মুভি ও হলের উন্নতি যদি আমরা চাই তাহলে আমাদের নিন্দা না করে ছবিটি দেখে, প্রশংসা করে ও কিছু সাজেশন দিয়ে ববি, ইফতেখার, জাজ এর মত সাহসী প্রযোজক, পরিচালক দের উৎসাহ দিতে হবে। আমি রিভিউ বছরে ২-১ বার দেই ভাল বাংলা মুভি পেলে, ভুল ত্রুতি থাকলে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।