Categories
অন্যান্য

একুশ আমার মা

যখন অক্ষর চিনিনি তখন মা ভাষা ভালোবাসতে শিখিয়েছেন। কখনও কি মা বলেছিলেন যে পড়ো ‘অ’, ‘আ’, ‘ক’, ‘খ’…! সত্যিই আমার মনে পড়েনা। খুব সম্ভবত এসবের সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎকার হয় স্কুলে ভর্তি হয়ে যখন স্কুল থেকে নতুন বই হাতে ধরিয়ে দিলো তখন। আমি অবাক দৃষ্টিতে বই নিয়ে ছুটেছিলাম বাড়ির পথে। মাকে নতুন বই দেখাব। অক্ষর দেখবো।

আজ শিখেছি ‘অ’, ‘আ’ এই দুটি বর্ণ। আচ্ছা এদেরকে বর্ণ বলে কেন?মায়ের মুখে শুনেছি আমি দুই বছর বয়স থেকে স্পষ্ট কথা বলি। তাহলে আমাকে মা স্কুলে যাওয়ার আগে পর্যন্ত কেন অক্ষর চেনাননি? কি করেছিলেন আমার মা?মা ছেলেবেলায় রাতে পাশে বসিয়ে গল্প শোনাতেন। গল্পে ছিল নানান রকম বইয়ের কথা, ধর্মের কথা, জীবন যাপন পদ্ধতির কথা, কবিতার কথা, রাজনীতি আরোও কত কি! আর আমার ছিল ছোট্ট বয়সের উৎসুক কৌতুহল। মা আমার কৌতুহল বাড়িয়ে দিতে ছিল সদা তৎপর।

গল্পে টুইস্ট আনতে মায়ের জুড়ি মেলা ভার। মা হুটহাট ধাঁধা বলে বসতেন। আমার ছোট্ট মাথায় থাকতো জট খোলার তোলপাড়। আর মা তখন তাতে আরোও গিট্টু লাগাতেন। তখন মায়ের থেকে দাদী আমার আরোও ভালো বন্ধু। সে শোনাতো রূপকথার গল্প। রাজকুমারের কথা বলতে বলতেই হুট করে বলে বসতো ” তুমিতো আর রাজকুমারীদের মতো লক্ষী না। এজন্য তোমার জন্য কোনো রাজকুমার আসবে কেন? তুমি তো ঠিকমত খাবারই খাও না। ” হ্যাঁ – দাদী রাজকুমারের প্রসঙ্গ টেনে আনত প্রতিবেলা খাবারের সময় হলেই।

আর ছোট্ট আমি কি কঠিন শোকে পাথর হয়ে খেতে বসতাম!হ্যাঁ। তখন আমাকে বাংলা বর্ণমালা না চিনালেও বাংলা ভাষাকে প্রাণ জানতে শিখিয়েছেন আমার মা। এর ভেতরের যে নিগূঢ় রস আছে তা কি করে শুষে নিতে হয় অমৃত সুধা হিসেবে তাই শিখিয়েছেন। আমার প্রথম একুশ বলতে যা মনে পড়ে একুশ মানে একটা শহীদ মিনার, পদতলে বাগানের ফুল, খালি পা, চারিদিকের বাজতে থাকা – ” আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো…”, শোভিত মিছিল গ্রামের পর গ্রাম, পুরো শরীর জুড়ে কি অদ্ভুত শিহরন, কিছুই জানিনা অথচ কেমন বুক চিনচিনে ব্যাথা, চোখের কোণের অগোচরে ঝরে পড়া একফোঁটা অশ্রু, চারিদিকে এত এত মানুষের মাঝে বুক জুড়ে কি গগন বিদারী চিৎকার।

কিন্তু তা কিসের জন্য ছিল?যখন দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ি তখন প্রথম কচুর ডগা আর ঝাড়ুর কাঠি এক করে শহীদ মিনার বানিয়ে ফেললাম নিজেই; আমার খেলাঘরে। সেখানে ফুলের স্তূপ জড়ো করলাম একে একে। একসময় মুখ লাল করে মাকে নিয়ে গেলাম দেখাতে। মায়ের চোখে তখন চকচক করেছিল জল। মা নিজেকে সামলাতে পারেননি সেদিন। কি কান্না সে! সেদিন প্রথম মা একুশের মানে বুঝলেন! আমিও কান্না করলাম অঝোরে। অশ্রুর জল গড়িয়ে পড়লো আমার বানানো সেই শহীদ মিনারেও।তখনও আমি ইংরেজি সেভাবে আয়ত্ত করতে পারিনি। এজন্যই দুঃখ ছিল আমার আকাশচুম্বি।

‘৫২ তে আমি থাকলে কেমন করে কথা বলতাম মায়ের সাথে বাংলা ছাড়া!পরদিন স্কুলে গেলে সে গল্প শুনিয়েছিলাম সবাইকে। মা ছাড়া এতো গল্প কে জানে! মা ছিল আমার গল্পের ভাড়। সকল প্রশ্নের সঠিক জবাব। মা তো মা ই -এরপর থেকে একুশ এলেই শিমুল, কৃষ্ণচূড়ার রঙে কি গদগদে ক্ষত আরোও স্পষ্ট হয় বুকে। একুশ এলেই ভেসে আসে বর্ণমালা, ভেসে আসে ভাষা। মায়ের সাথে ছেলেবেলার সব গল্প, ধাঁধা, প্রকৃতি, রাজনীতি-জীবন। কি অদ্ভুত এক একুশ আমাদের। গর্বে বুক ফুলে ওঠে। আবার ওই ফুলে ওঠা বুকে জন্ম হয় মায়ের জন্য দুঃখ। ভাষা শহীদদের জন্য দুঃখ।সেই বায়ান্নের ভাষা শহীদ যাদেরকে দেখিনি, চিনিনা, যার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ কোনোকালে ছিল না তাদের কথা মনে হতে যদি এতো দুঃখ নামে মন জানালায়; তাহলে যে মানুষটা পৃথিবীর আলো দেখলো। ভাষা শিখালো। জীবন চিনালো। সেই মানুষটা কেমন করে নেই! ‘৫২ থেকে এতগুলো বছর মাড়িয়ে এইযে এতো এতো হৃদয়ের রক্তক্ষরণ ভাষার জন্য আত্মত্যাগের কথা ভেবে। সে তো শুধু বেড়েছে প্রতিনিয়ত একটু একটু করে। প্রতিদিন কত বাঙালি মায়ের বিদেহী আত্মা মিশে যায় ভাষা শহীদদের রক্তের সাথে, শহীদ মিনারের মাঝখানের লাল বৃত্তে। সেখানে জ্বলজ্বল করে দুঃখিনী বাংলা বর্ণমালা। তাই অনুভূতি প্রকাশেই বুঝি মা আছে আমার ভাষায়। আর বাংলা ভাষা মানেই একুশ। আর একুশতো আমারই মা।

– একুশ আমার মা

আকিব হাসান পাভেল